অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থানকে ভারতের সরকারি মানচিত্রে নির্ধারিত নামে অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে চীন; রোববার বেইজিং বলেছে, ভারতের এই একতরফা উদ্যোগ সীমান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে পারে এবং ভারত-চীন সম্পর্কের উন্নতির পথেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, অরুণাচল প্রদেশের স্থানগুলোর সরকারি নাম মানচিত্রে যুক্ত করার ভারতীয় পদক্ষেপকে বেইজিং ‘আত্মপ্রবঞ্চনা’ হিসেবে দেখছে এবং মনে করছে, এতে সীমান্ত বিরোধ সমাধানের প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক চিয়ান ফেং বলেন, ভারত-চীন সম্পর্ক যখন উন্নতির দিকে এগোচ্ছে এবং দুই দেশের নেতাদের বহুপক্ষীয় বিভিন্ন মঞ্চে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, তখন ভারতের এমন একতরফা পদক্ষেপ সীমান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে পারে। তার মতে, সীমান্ত ইস্যুকে আরও বড় বিরোধে পরিণত করা থেকে ভারতের বিরত থাকা উচিত।
চিয়ান ফেং আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তার মূল্যায়নে, সীমান্ত প্রশ্নে উত্তেজনা বাড়ানো হলে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সম্প্রতি চীনের বিভিন্ন সময়ে অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থান নতুন নামে চিহ্নিত করার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে গত শুক্রবার ভারত তাদের সরকারি মানচিত্রে রাজ্যটির ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নির্ধারিত নাম যুক্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি, চারটি পর্বতগিরিপথ, একটি হ্রদ এবং একটি স্মৃতিসৌধ।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র মানচিত্রে এসব নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য হলো স্থানগুলোর সঠিক পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। অর্থাৎ, দিল্লি এই পদক্ষেপকে প্রশাসনিক ও মানচিত্রগত স্বীকৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে চীন অরুণাচল প্রদেশের ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবি স্বীকার করে না। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন গত ১৪ এপ্রিল এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেন, চীন ‘অরুণাচল প্রদেশ’কে স্বীকৃতি দেয় না।
গ্লোবাল টাইমস জানায়, ২০১৭ সাল থেকে চীনের বেসামরিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের জন্য ছয় দফায় মানসম্মত নাম প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১১২টি স্থানের নাম ঘোষণা করেছে চীন; এসব নামের সঙ্গে চীনা ও তিব্বতি ভাষায় নাম এবং ভৌগোলিক স্থানাঙ্কও দেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে গুও জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন-ভারত সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি; পাশাপাশি তিনি উভয় দেশকে একই দিকে কাজ করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওশান স্টাডিজের অধ্যাপক গুও শুয়েতাং বলেন, অরুণাচলের ২৭টি স্থানকে নতুন করে সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা ভারতের একটি একতরফা প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তার মতে, এতে ওই এলাকার আইনি অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।
গুও শুয়েতাংর দাবি, ভবিষ্যৎ সীমান্ত আলোচনায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো করা এবং অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ের জন্য ভারতের এই উদ্যোগ। তবে এর বাস্তব কোনো অর্থ নেই; বরং এটি দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত আলোচনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস কমাবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীন-ভারত সীমানা সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো ঐতিহাসিক ও আইনি নীতিমালার ভিত্তিতে সমতাভিত্তিক আলোচনা এবং একটি ন্যায্য নিষ্পত্তি। এই প্রেক্ষাপটে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে বা স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করে এমন একতরফা পদক্ষেপ সীমান্ত স্থিতিশীলতা দুর্বল করতে পারে—এমন বার্তাই বেইজিং আবারও জোর দিয়ে তুলে ধরেছে।