ডেল্টা ফার্মা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোনে (এনএসইজেড) অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে, আর কোম্পানিটির লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি এগোচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে মোট ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে কোম্পানিটির দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেস পিএলসি ও ডেল্টা এপিআই লিমিটেড। এর প্রথম ধাপে বিনিয়োগ করা হবে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে প্রতিষ্ঠান দুটি মোট ৪২ একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে। ২০২৫ সালে প্রথমে ৩০ একর জমি পায় ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেস, পরে চলতি বছরের ৫ জুলাই ডেল্টা এপিআই লিমিটেড-এর নামে আরও ১২ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের আওতায় ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেস একটি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ফিল-ফিনিশ ও ফর্মুলেশন ফ্যাসিলিটি স্থাপন করবে। এর পাশাপাশি থাকবে ইনজেকশন ও মুখে খাওয়ার সলিড-ডোসেজ ওষুধের জন্য একটি অনকোলজি ইউনিট, একটি হারবাল, নিউট্রাসিউটিক্যাল ও প্রাকৃতিক ওষুধের ইউনিট, একটি এআই-চালিত উৎপাদন ইউনিট এবং একটি আধুনিক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র।
প্রস্তাবিত কারখানাগুলোতে হারবাল ও নিউট্রাসিউটিক্যাল পণ্যের পাশাপাশি ক্যানসার-প্রতিরোধী ওষুধ, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, এরিথ্রোপোয়েটিন, ফিলগ্রাস্টিম, টপিক্যাল ক্রিম ও অয়েন্টমেন্ট উৎপাদন করা হবে। অন্যদিকে ডেল্টা এপিআই লিমিটেড ১২ একর জমিতে ১২.৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে এপিআই উৎপাদন কারখানা স্থাপন করছে, যেখানে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন হবে।
ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাদের প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝে পেয়েছে। এরপর ডিজিটাল সার্ভে ও সয়েল টেস্ট শুরু করা হয়েছে, তবে টানা বৃষ্টির কারণে সয়েল টেস্টের কাজ শেষ করতে দেরি হয়েছে।
তিনি বলেন, জমিতে ভবন, সড়ক কিংবা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের আগে গভীর পাইলিং প্রয়োজন হয়। সয়েল টেস্টের পর সীমানাপ্রাচীরের নকশা অনুমোদন, সাইট মাস্টারপ্ল্যান তৈরি এবং স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা প্রস্তুতসহ আরও কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
জাকির হোসেনের ভাষ্য, এসব কাজ করতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগে, এরপর নির্মাণকাজ শেষে উৎপাদনে যেতে আরও তিন বছর প্রয়োজন। তাই সব মিলিয়ে ২০২৯ সালের আগে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে না।
এপিআই শিল্পকে পুঁজি-নিবিড় খাত উল্লেখ করে তিনি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে অবকাঠামোগত সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বেজা দিয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি; পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা যাতে বাধাহীনভাবে কাজ করতে পারেন, সে জন্য প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও নিয়মিত তদারকির ওপরও গুরুত্ব দেন।
এপিআই হলো ওষুধের মূল কার্যকরী উপাদান, আর এক্সিপিয়েন্ট হলো ফর্মুলেশনে ব্যবহৃত নিষ্ক্রিয় পদার্থ। বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত এপিআইয়ের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়; জাকির হোসেন বলেন, ওষুধের কাঁচামালের ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ এখনো আমদানি করতে হয়।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে ১৫২ থেকে ১৫৫টি দেশে ফিনিশড ওষুধপণ্য রপ্তানি হয় এবং দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত ওষুধের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এখন এপিআই খাতে এগিয়ে যাওয়া জরুরি, কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কাঁচামাল আমদানির বিদ্যমান সুবিধা কমে যাবে।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আটটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার একটি ওষুধশিল্প। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৩৮.৪৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ওষুধ রপ্তানি করেছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২১৩ মিলিয়ন ডলার; সরকার মনে করছে, এ খাতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে এবং রপ্তানি আরও বাড়ানোর বড় সুযোগ আছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিনিয়োগ হলে উচ্চমূল্য ও বিশেষায়িত ওষুধে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, সরকার ওষুধকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে দেখছে এবং দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
তিনি বলেন, হেলথকেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যাচ্ছে, এটি ইতিবাচক খবর, আর ডেল্টা ফার্মাও এনএসইজেডে জায়গা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল এনএসইজেড মিরসরাই উপকূলের ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠছে। এখানে শিল্পকারখানার পাশাপাশি আধুনিক নগর সুবিধাও থাকবে, যা বড় শিল্প বিনিয়োগের জন্য অঞ্চলটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।