নিরাপত্তা পেলে দেশে ফিরে আদালতে দাঁড়াতে চান সাকিব আল হাসান

সাকিব আল হাসান বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে তিনি দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলায় আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ৩৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি দেশে ফিরে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চান এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর আগে দেশের মাটিতে একটি শেষ সিরিজ খেলতে আগ্রহী।

সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব বলেন, সরকার যদি তাকে এই মর্মে ক্লিয়ারেন্স দেয় যে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, তবে তিনি আনন্দের সঙ্গে দেশে ফিরবেন। তার ভাষায়, আদালতের বিচার এবং যা যা করা প্রয়োজন, সবকিছুরই মুখোমুখি হতে তিনি রাজি। শ্রীলঙ্কা থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলার ফাঁকে তিনি এসব কথা বলেন।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাকিব বলেন, তিনি জানেন তিনি কিছুই করেননি। গত দুই বছর দেশের বাইরে থাকা নিয়ে এটিই তার সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য। তিনি আরও জানান, এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি এবং ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার আশা রাখেন।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। গণ-অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ক্রিকেটার বলেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করলে তিনিও তার সঙ্গে ফেরার চেষ্টা করবেন।

শেখ হাসিনার বিষয়ে সাকিব বলেন, আমাদের ক্যাপ্টেন যা বলবেন, তারা তা-ই অনুসরণ করবেন। তিনি মনে করেন, তারাই ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন এবং যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সেটিই তারা মেনে চলবেন। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডাদেশ রয়েছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশে সাকিবের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি কেবল শান্তি ও বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলেছেন এবং এজন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই। আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে—এমন পরামর্শও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সাকিব জানান, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা ‘বানোয়াট’ মামলাগুলো প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী বলেও জানান। তবে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ.এ.এম. সালেহ বলেন, সাকিব পতিত, পরাজিত এবং পলাতক ফ্যাসিবাদী সরকারের একজন সদস্য ছিলেন, যার পরিণতি এখন তাকে ভোগ করতে হচ্ছে।

প্রেস সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সাকিব আল হাসানের জন্য হারানো সমর্থন ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান সরকারের কিছুই করার নেই। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের আইন সবার জন্য সমান; পরিচয় বা মর্যাদা বিবেচ্য নয়। আইনের চোখে সাকিব একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

সাকিবের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুটি মামলা সক্রিয় রয়েছে। একটি গণ-অভ্যুত্থানের সময় এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে, অন্যটি দুর্নীতি দমন কমিশনের আনা দুর্নীতির মামলা। হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে যেদিন ঘটনাটি ঘটেছে, সেদিন তিনি টরন্টোতে ম্যাচ খেলছিলেন; তাই এটিকে তিনি ‘হাস্যকর মামলা’ বলে অভিহিত করেন।

তদন্তাধীন থাকার কারণে গত দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সাকিব। তিনি বলেন, গত ১০ বছর ধরে সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে সব কর পরিশোধ করার পরও তদন্তের নামে তার অ্যাকাউন্ট আটকে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিতে তিনি প্রস্তুত, তবে কিছু না পেলে অ্যাকাউন্টগুলো ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

দেশে ফেরার একটি ব্যর্থ চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন সাকিব। তার দাবি, ২০২৪ সালের শেষের দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাসে তিনি দেশের উদ্দেশে ফ্লাইট ধরেছিলেন, কিন্তু বিমানবন্দর লাউঞ্জ থেকে কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করার পর মাঝপথে তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। দুবাইয়ে নেমে তিনি আবার নিউইয়র্কে ফিরে যান; তার ভাষায়, ১২ ঘণ্টার মধ্যে কী বদলে গিয়েছিল তিনি জানেন না, যদিও এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল ৫৭ দিন ধরে।

সাকিবের অভিযোগ, পরবর্তীতে শেখ হাসিনার জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর কারণেই তার ফেরা আটকে দেওয়া হয়। অবসর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি এখনও অধিকাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলছেন, শরীর ভালো আছে এবং খেলাটি উপভোগ করছেন; তবে বয়স তার পক্ষে নেই, তাই খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে পারবেন না।

ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টের কথাও তুলে ধরেন এই ক্রিকেটার। তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না; তারা বাংলাদেশে থাকলেও দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছেন না। তার ভাষায়, এটি তাদের সবার জন্য খুব কঠিন সময়, তবু তারা টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

সাকিবের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার দলের বহু নেতা-কর্মী ও সহযোগী ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েছেন; ফলে সাবেক ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কী অবস্থান নেয়, সাকিবের ফেরা সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দেখা দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *