সৌদি আরব ১৪ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করল

সৌদি আরব বৃহস্পতিবার রিয়াধে পাকিস্তান, বাংলাদেশ-সহ ১৪ দেশকে নিয়ে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স নামে নতুন সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। জোটের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে এই জোটের মূল লক্ষ্য।

নতুন এই জোটে সৌদি আরব, পাকিস্তানবাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে তুরস্ক, কুয়েত, বাহরিন, কাতার, জর্ডন, মিশর, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং কোমোরোস। আফ্রিকা ও এশিয়ার উপকূলবর্তী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলিকে এক ছাতার নিচে এনে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করাই রিয়াধের তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জোট গঠন উপলক্ষে আয়োজিত বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। তবে পশ্চিম এশিয়া-আফ্রিকা উপকূলে ইইউর নৌ নিরাপত্তা মিশন অ্যাসপিডিস-এর সঙ্গে নতুন জোটের সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে সৌদি আরব বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

সৌদি সরকার জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সামরিক মহড়া এবং সমন্বিত অভিযান হবে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স-এর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্র। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও শর্তপূরণ সাপেক্ষে অন্য দেশও এই সামরিক জোটে যোগ দিতে পারবে বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে।

এই ঘোষণা এসেছে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সইয়ের ঠিক ১০ মাস পরে। গত সেপ্টেম্বরে, অপারেশন সিঁদুর-এর চার মাস পরে, সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ‘পারস্পরিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ

সেই যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও দেশের আগ্রাসনের শিকার হলে, তা দুই দেশের উপর অভিন্ন আঘাত হিসেবে দেখা হবে। ওই চুক্তি সম্পর্কে নয়াদিল্লি শীতল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। নতুন বহুপাক্ষিক সামরিক জোট গঠনের ফলে রিয়াধ-ইসলামাবাদ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত হল বলেই মনে করা হচ্ছে।

নতুন জোট গঠনের নেপথ্যে ইয়েমেনের শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি বাহিনীর হুমকি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ‘লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত বাব এল-মান্দেব প্রণালীকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বলে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

ইরানের মদতপুষ্ট হুথি বাহিনী ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলে তেলবাহী সৌদি জাহাজে রকেট হামলা চালিয়েছে। এর ফলে শুধু সৌদি আরব নয়, গোটা অঞ্চলের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলি বাব এল-মান্দেব ঘিরে কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে আরও তীব্র করেছে।

হরমুজ় প্রণালীতে সঙ্কটের কারণে লোহিত সাগর-এডেন উপসাগর-আরব সাগর সংযোগকারী এই জলপথের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকাইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পরে হরমুজ় প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল কার্যত তলানিতে ঠেকেছিল। সেই সময় থেকেই পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে পণ্য-যোগাযোগের অন্যতম বিকল্প পথ হয়ে ওঠে বাব এল-মান্দেব

কিন্তু বিকল্প এই নৌপথে হুথি হামলার জেরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় সৌদি আরব দ্রুত বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন জোটকে হুথি দমনের লক্ষ্যেই রিয়াধের সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম এশিয়া, লোহিত সাগর উপকূল এবং আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়। বাব আল-মান্দেব প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবাহিত হয়। সেই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *