ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইসরায়েল রক্ষায় অস্ত্রঘাটতির সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রে

যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ পেন্টাগনে পাঠানো এক মেমোয় সতর্ক করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র হারাতে পারে। ফাঁস হয়ে যাওয়া ওই মেমোয় তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৌ অবরোধের কারণে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে হাতে থাকা সমরাস্ত্র কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শক্তিশালী রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন নৌবাহিনীর পাঁচটি ডেস্ট্রয়ার বহু বছর ধরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু নৌ অবরোধের কারণে আরেকটি যুদ্ধজাহাজ সময়মতো মোতায়েন করা সম্ভব না হলে, ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ইসরায়েলের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মেমোয় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মেমোটি মার্কিন গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়।

ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের নেওয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবে আরব সাগরে ১১টি যুদ্ধজাহাজ ও দুটি বিমানবাহী রণতরিসহ একটি বড় মার্কিন নৌবহর মোতায়েন করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর এর জবাবে ট্রাম্প এই অবরোধ কার্যকর করেন। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, আর প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

শনিবার ট্রাম্প ইরানকে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার হুমকি থেকে সরে এসে বলেন, শান্তিচুক্তি হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় তিনি ইরানে হামলা বাতিল করেছেন। তার ভাষ্য, তেহরানের অনুরোধে তিনি হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় হামলা এবার চালানো হতো, তবে দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলে হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ আমাদের কাছে অনুরোধ করেছে, যেন আমরা হামলা না চালাই। কারণ একটি চুক্তির মূল কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যে থাকবে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে, সম্পূর্ণ এবং শতভাগ উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান।’

এর আগে শুক্রবার ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেন। পরিকল্পনা ছিল, এই সপ্তাহান্তে হামলা শুরু হবে, কয়েক দিন ধরে চলবে এবং এর উদ্দেশ্য হবে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করা। এ ছাড়া পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনেও হামলার পরিকল্পনা ছিল।

ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ লুকিয়ে রেখেছে, যা থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান প্রস্তুত করা সম্ভব। তবে গত সপ্তাহে এক মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। তার মতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় সব ধরনের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র আমাদের নেই। তবে আমার মনে হয় না, হোয়াইট হাউস বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।’ এই মন্তব্যের সঙ্গে গ্রিনকেভিচের মেমোর সতর্কতার মিল পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর বাড়তি চাপের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (২৮ বিলিয়ন পাউন্ড)। মে মাসে দেওয়া সর্বশেষ হিসাবের তুলনায় এটি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার (৬ বিলিয়ন পাউন্ড) বেশি।

হেগসেথ পেন্টাগনের জন্য কংগ্রেসের কাছ থেকে আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলার (৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড) বরাদ্দ চেয়েছেন। এর মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলার (৪৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড) মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানের জন্য ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানকে ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি, নৌ অবরোধ, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা এবং সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত ও আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *