মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি না হলেও, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকলে যুদ্ধবিরতি ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ বাড়ানোর পথ বিবেচনা করছেন। রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত হয়, তাহলে ট্রাম্প সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার দিকেই বেশি ঝুঁকবেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তার জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের মতে, তেহরান পুরোপুরি হরমুজ খুলে দিলে ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধও তুলে নিতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলাতে এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক জটিলতা কাটার অপেক্ষা করতে চান, বিশেষ করে যতক্ষণ জ্বালানির দাম বর্তমান অবস্থায় থাকে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, গত বছরের জুনে পরিচালিত অপারেশন মিডনাইট হ্যামার-এ ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় তেহরানের পক্ষে দ্রুত সেই কর্মসূচি পুনরায় চালু করা কঠিন হবে। তার বিশ্বাস, ইরান স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করলে বা গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্যোগ নিলে তা মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়বে। ভবিষ্যতে আবারও মার্কিন হামলার আশঙ্কা ইরানের জন্য ‘দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা’ হিসেবেও কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন।
হোয়াইট হাউস-এর এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং এখন প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রবাহ নিশ্চিত করা। তবে ইরান ভবিষ্যতে জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখবে। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্পও বলেন, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদী এবং তার ধারণা, ইরান আর বেশি দিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারবে না।
কিন্তু শনিবার ট্রাম্পের এই কৌশলে বড় ধাক্কা দেয় ইরান। হরমুজে অবাধ যাতায়াতের বিনিময়ে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, মার্কিন সেনা ও নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারসহ একগুচ্ছ দাবি তোলে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর শুক্রবার ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘তার আচরণ সংশোধন’ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
জোলকাদর ছয়টি শর্ত দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে; ইরানকে আর কখনো মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া যাবে না; নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে সব নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে; ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধগুলোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে; এবং ইরানের জব্দ করা সব সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ইরানের কঠোর শর্তগুলো ট্রাম্পের জন্য সংঘাত থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। ইউরেশিয়া গ্রুপ-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ইরানিরা বিশ্বাস করে ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে যেতে চান এবং তার মূল লক্ষ্য এখন হরমুজ খুলে দেওয়া; এ কারণেই তারা কঠোর দরকষাকষির কৌশল নিয়েছে।
গত এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া কূটনৈতিক আলোচনার ওপর ছায়া ফেলেছে হোয়াইট হাউসের সেই আল্টিমেটাম, যাতে বলা হয়েছে ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে ট্রাম্প পারমাণবিক ইস্যুটিও জুড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউস পুরো মনোযোগ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ওপর কেন্দ্রীভূত করেছে। বিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ করার সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান বাণিজ্যিক নৌচলাচল থামিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্ব তেলের বাজারকে টালমাটাল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাকি আর তিন মাসেরও কম, আর ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় জ্বালানির দাম এখন আকাশছোঁয়া। এমন অবস্থায় ট্রাম্প এমন একটি পথ খুঁজছেন, যাতে অন্তত আমেরিকান জনগণের কাছে তিনি দাবি করতে পারেন—এই যুদ্ধে তিনিই জিতেছেন। শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে তিনি পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই নিজের জয় নিশ্চিত হওয়ার ইঙ্গিত দেন এবং ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জিতে গেছেন’ শিরোনামের একটি নিবন্ধের লিংকও শেয়ার করেন।
তবে অর্থের প্রশ্নটি ট্রাম্প প্রশাসনের বড় মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ের চুক্তির পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দাবি করেছে ইরান; ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে উন্মুক্ত বাজারে ইরানকে তেল বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড় দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। গত জুনে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে এই ছাড়ে রাজি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলার পর সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় এবং ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের অর্থ হলো হরমুজ প্রণালি ‘এই মুহূর্তে এক প্রকার খোলাই আছে’। তবে তিনি স্বীকার করেন, তেহরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মাইন দিয়ে জাহাজের ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের ভূগর্ভে মজুত থাকা ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে তার বিশেষ উদ্বেগ নেই।