সরকার চলতি মাসে সব মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালু করতে যাচ্ছে, যেখানে চলমান প্রকল্পগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেতে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে। আইএমইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো এবং তদারকি আরও কার্যকর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড্যাশবোর্ডটির উদ্বোধন করতে পারেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়র সঙ্গে আলোচনা করে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে এবং এ মাসের মধ্যেই এটি চালুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি খুবই খারাপ বা অসন্তোষজনক, সেগুলোকে লাল রঙে চিহ্নিত করা হবে। সন্তোষজনক অবস্থায় থাকা প্রকল্পগুলো থাকবে সবুজ শ্রেণিতে, আর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা প্রকল্পগুলোকে হলুদ রঙে দেখানো হবে।
আইএমইডি কর্মকর্তারা জানান, একাধিক সূচকের ভিত্তিতে প্রকল্পগুলোর শ্রেণি নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প কতবার সংশোধন করা হয়েছে, কতবার মেয়াদ বেড়েছে, ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি, বছরভিত্তিক অগ্রগতি, বাস্তবায়নে সুশাসন, ক্রয় কার্যক্রমের অগ্রগতি, ভূমি অধিগ্রহণ এবং জনবল ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি।
চলমান প্রকল্পের র্যাঙ্কিংয়ের জন্য একটি নীতিমালা তৈরির কাজও চলছে। আগামী ১৯ আগস্টের মধ্যে সেই নীতিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ড্যাশবোর্ডে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, সরকারের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতিও দেখানো হবে। শুরুতে এটি কেবল প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিবেরা দেখতে পারবেন; পরে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে।
এই প্ল্যাটফর্মে প্রকল্প পরিচালকদের নাম ও ফোন নম্বরের পাশাপাশি ক্রয় কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন প্যাকেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের তথ্যও থাকবে। কর্মকর্তারা বলছেন, এতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন পারফরম্যান্স তদারকি করা সহজ হবে এবং কোন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এগোচ্ছে, কোনটি শূন্য অগ্রগতিতে আটকে আছে, তা দ্রুত বোঝা যাবে।
আইএমইডির একটি প্রকল্পের আওতায় ড্যাশবোর্ডটি তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম এবং বাস্তবায়নগত অবস্থান সরাসরি দেখা যাবে, ফলে প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবেন।
তবে তথ্যের ঘাটতি এখনো বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। কর্মকর্তারা জানান, ইলেকট্রনিক প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ই-পিএমআইএস) সফটওয়্যারে প্রতিটি প্রকল্পের মাসিক অগ্রগতির তথ্য দেওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিয়মিত তা আপলোড করে না।
বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও প্রতি মাসে তথ্য না আসায় প্রকল্পের অগ্রগতি সঠিকভাবে তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনি ক্ষমতা না থাকায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তথ্য দিতে বাধ্য করাও যাচ্ছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে নতুন ড্যাশবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্য ও সচিবেরা সরাসরি তদারকি করলে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে বলে তাদের ধারণা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন, তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী জবাবদিহিতা কাঠামোর ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের তথ্য উন্মুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন এবং অন্যদের নজরদারির কারণে আরও সতর্ক থাকবেন।
তবে তার মতে, শুধু তথ্য দেখা বা দেখানোই যথেষ্ট নয়; দেরির কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেতভিত্তিক রেটিং ভালো সংকেত হলেও কোনো মন্ত্রণালয়ের বড় অংশের প্রকল্প লাল শ্রেণিতে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কী ধরনের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, তা স্পষ্ট থাকা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, খারাপ পারফরম্যান্সে শাস্তি হবে কি না, ভালো করলে পুরস্কার থাকবে কি না—এই কাঠামো পরিষ্কার না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। একই সঙ্গে অনেক সময় প্রকল্প বিলম্বের পেছনে একাধিক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার জটিলতা, সরবরাহ সমস্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বাস্তব কারণও থাকতে পারে; তাই প্রকৃত দায় নির্ধারণে যথাযথ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, প্রকল্প পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগটি সময়োপযোগী হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের উন্মুক্ততা ও ব্যবহারের ওপর। তার মতে, ড্যাশবোর্ডের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হলে এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য জনসম্মুখে এলে তবেই কার্যকর পরিবর্তন আসে।
তিনি ড্যাশবোর্ডটি সবার জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি মন্ত্রীদের সময় সীমিত থাকায় তারা সব সময় বিস্তারিত ড্যাশবোর্ড বিশ্লেষণ করতে পারবেন না উল্লেখ করে তিনি প্রস্তাব দেন, আইএমইডি যেন ড্যাশবোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি মাসে সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রী ও সচিবদের কাছে পাঠায়, যাতে জবাবদিহির চাপ আরও বাড়ে।